উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর কম্পিউটার শিক্ষার নতুন সিলেবাস ও কিছু কথা

নতুন শিক্ষানীতির আলোকে ২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকার ষষ্ঠ শ্রেণীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি নামক একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে যা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করি। “ষষ্ঠ শ্রেণীতে বাধ্যতামূলক কম্পিউটার শিক্ষা” শিরোনামে গত ১০ আগস্ট, ২০১১ তারিখে বিডিনিউজ-এ দেশের একজন খ্যাতনামা কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কিবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনকের একটি লেখা আমার নজরে আসে। লেখাতে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণীতে বাধ্যতামূলক কম্পিউটার শিক্ষার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আইসিটির কথা নিয়ে এসেছেন। আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষা ও কম্পিউটার শিক্ষাকে প্রায়ই আমরা গুলিয়ে ফেলি। অনেকেই আইসিটি ও কম্পিউটার শিক্ষাকে একে অপরের সমার্থক শব্দ বলে মনে করে। অনেকে মনে করে আইসিটি মানেই কম্পিউটার শিক্ষা। কিন্তু ধারণাটি সঠিক নয়। আইসিটি একটি বৃহৎ পরিসর, যার একটি টুল বা হাতিয়ার হচ্ছে কম্পিউটার। এরকম আরো কয়েকটি হাতিয়ার হলো মোবাইল ফোন, ল্যান্ড ফোন, টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদি (শিক্ষানীতি দ্রষ্টব্য)। তাই আমাদের প্রথমে দেখতে হবে আমাদের কী শেখাটা জরুরী, আইসিটি না কম্পিউটার শিক্ষা? লেখকের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি এক্ষেত্রে সরকার শিক্ষার্থীদের আইসিটি শেখাতে তৎপর। বর্তমান যুগে আইসিটিতে কম্পিউটার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু পূর্বের চেয়ে বর্তমানে কম্পিউটার শেখাটা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। শহর অঞ্চল এমনকি গ্রাম অঞ্চলেও এখন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যারা অল্প টাকার বিনিময়ে কম্পিউটারে হাতেখড়ি দিয়ে দিচ্ছে। চাইলে কোনো কোনো বিষয়ে দক্ষ করার কোর্সও করানো হচ্ছে। যেমন- ছবি সম্পাদনার কাজ, এনিমেশন তৈরির কাজ ইত্যাদি। এছাড়া আছে প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র। কেন্দ্রগুলো কম্পিউটার বিষয়ক নানান ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু কম্পিউটার শেখানোর উদ্দেশ্যে যদি আইসিটি শিক্ষাক্রমটি চালু করা হয় তবে তা হবে দুঃখজনক একটি ব্যাপার হবে। তাহলে এতো সময়ের অপচয় ও অর্থ ব্যয় করার কোন প্রয়োজন পড়ে না। সংক্ষিপ্ত কোন কোর্স করালেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায়। আশা করছি আইসিটি ও কম্পিউটার শিক্ষার মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্ট করতে পেরেছি। আইসিটি বিষয়টি প্রাথমিকভাবে ষষ্ঠ শ্রেণীতে দেয়া হচ্ছে, যা পরবর্তীতে সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণীতে দেয়া হবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এই বিষয়টি আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়েও দেখতে পারবো। বিষয়টির নাম হিসেবে আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি হওয়াই যথাযথ। যদিও এটি একটি বড় ক্যানভাস, তাই বলে আমরা একে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না। বরং বিষয়টিতে আমরা পর্যায়ক্রমে কম্পিউটারসহ মোবাইল ফোন, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতা শেখানোর কনটেন্টস দেয়া যেতে পারে। বিষয়গুলো নিয়ে অল্প অল্প আলোচনা করা যেতে পারে, যাতে তিন বছর পরে শিক্ষার্থীরা একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারে। পাঠক্রমে তিনটি শ্রেণীতে বিষয়বস্তুর পরিবর্তন খুব কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা শিক্ষা বিষয়টি নিয়ে একটু পড়াশোনা করেছি তারা একটু হলেও জানি যে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমের একটি সাধারণ লক্ষ্য হলো- “শিক্ষার প্রত্যেক স্তরে সংশ্লিষ্ট স্তরের পূর্ববর্তী স্তরে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত দৃঢ় করা এবং এগুলোর সম্প্রসারণে সহায়তা করা।” (শিক্ষাবিজ্ঞান ও বাংলাদেশের শিক্ষা: পৃ-১৯৩, প্রকাশকাল-এপ্রিল,২০০৭) অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীতে যা থাকবে তা সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীতেও ধারাবাহিক ভাবে থাকবে ও তার সম্প্রসারণ থাকবে। তাই আইসিটি বিষয়েও এ নিয়মটি মানা হয়েছে। এছাড়া ওয়ার্ড প্রসেসিং, স্প্রেডশিট ও ইন্টারনেট বিষয়গুলোর বিস্তৃতিও অনেক বড়। এছাড়া নিত্যনতুন অনেক ফিচার এখানেও যুক্ত হচ্ছে তাই আমার মনে হয় শিক্ষার্থীদের একই বৃন্তে আবদ্ধ করছে না। তবে চাইলে অন্যান্য সফটওয়্যার সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা দেয়া যেতে পারে। এর সাথে সাথে অন্যান্য বিষয় যেমন- মোবাইল ফোন, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা থাকতে পারে। এ বিষয়ে শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। আগ্রহীরা শিক্ষানীতিতে অধ্যায় ১২-তে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি দেখে নিতে পারেন। লেখক তার লেখায় লিখেছেন “বইটিতে ওয়ার্ড প্রসেসিং শেখানোর জন্য এমএস ওয়ার্ড ও ওপেন অফিস একই সাথে শেখানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।” কিন্তু পাঠ্যক্রমে বলা আছে ওয়ার্ড প্রসেসিং শেখাতে হবে, এ জন্য যে কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করে তা করা যেতে পারে। আমাদের দেশে এখন বেশি ব্যবহার করা হয় এমএস ওয়ার্ড, কিন্তু এর দাম অনেক বেশি যা একটি বিদ্যালয়ের পক্ষে বহন করা কষ্টের। তাই এখন সবাই ঝুঁকছে ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের দিকে। ওপেন অফিস একটি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার, যাতে একজন ব্যবহারকারীর সকল প্রয়োজনীয় বিষয়ই যুক্ত করা আছে। শিক্ষক চাইলে যে কোনটিই শেখাতে পারেন। তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন্তত পক্ষে শিক্ষার্থীরা জানতে পারছে যে ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের জন্য শুধু এমএস ওয়ার্ডই না আরো কিছু আছে। এক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়বে বৈ কমবে না। আর বিষয়টি এতো জটিলও না যে তা শিক্ষার্থীদের জটিল অবস্থায় ফেলবে। বরং তারা আগ্রহ নিয়েই শিখবে। এই বয়সেই নতুন কিছু শেখার প্রতি আগ্রহ থাকে। আর ওপেন অফিস ও এম এস অফিসের বেশির ভাগ ফিচারই একই তাই এ বিষয়টি তাদেরকে বাড়তি চাপে ফেলবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে কম্পিউটার বিষয়টি ইংরেজির বদলে বাংলায় শেখাই বাঞ্ছনীয়। যদি কম্পিউটার শেখার একটি উদ্দেশ্য হতো যে শিক্ষার্থীরা এতে করে ইংরেজি শিখবে, তবে তা ভুল। আমরা প্রাথমিক শ্রেণী থেকেই ইংরেজি পড়ে আসছি, যা মাস্টার্স পর্যন্ত অব্যহত। তারপরও ইংরেজিতে কথা বলতে বা ফ্রি হ্যান্ড লিখতে পারছি না। তাই শুধু মাত্র কম্পিউটারের মেনু বার ইংরেজি থাকলেই যদি শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিখতে পারবে বলে ধরে নেয়া হয় তবে তাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব। এছাড়া যদি আমরা কয়েকটি উন্নত দেশের কথা বলতে চাই যেমন- চীন, জাপান, কোরিয়া তারা কিন্তু তাদের কম্পিউটার তাদের স্থানীয় ভাষায় ব্যবহার করে। কিন্তু তাতে তো তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। বরং এতে করে তারা সবাই কম্পিউটার ব্যবহারে সুবিধা পাচ্ছে। আমরা যদি শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষায় কম্পিউটার শিক্ষা দিতে পারি তবে তারা তাদের অভিভাবকদেরও তা শেখাতে পারবো। অনেকে শুধু মাত্র ইংরেজি জানে না বলেই কম্পিউটার ব্যবহার করতে ভয় পায়। তাদের জন্যেও বাংলায় স্থানীয়করণ সফটওয়্যারে কম্পিউটার শেখাটা জরুরি। আমরা দেখেছি বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়টি অনেকের কাছে ভয়ের একটি বিষয়, তার উপর যদি কম্পিউটারেও ইংরেজি থাকে তবে তাদের এই বিষয়ের উপর আগ্রহ কমে যাবে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন বাংলায় স্থানীয়করণ সফটওয়্যার তাদের কী কাজে লাগবে, এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে আমরা যদি শিক্ষার্থীদের প্রাথমিকভাবে বাংলায় স্থানীয়করণ সফটওয়্যার তুলে দিতে পারি তবে একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে যারা বাংলা ভাষায় কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে। এতে করে শিক্ষানীতির আরো একটি উদ্দেশ্য-‘বাংলা ভাষার উন্নয়নে আরো কার্যকরী ভুমিকা রাখা’ (অধ্যায় ২৮:১৫) পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে। এছাড়া এর মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে সর্বস্তরে বাংলা ভাষায় অনুবাদকৃত সফটওয়্যারের ব্যবহারের প্রচলন ঘটানো সম্ভব হবে ও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের আন্দোলন জোরদার হবে। বইটিতে উইন্ডোজের পাশাপাশি আমরা মুক্ত ও ওপেনসোর্স অপারেটিং সিস্টেমের কথাও আনতে পারি। আমরা জানি যে, ২০১৩ সাল থেকে মাইক্রোসফট তাদের পণ্য আর পাইরেসি করার সুযোগ দিবে না। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে এই পণ্যগুলো কিনতে হবে। যা যে কোনো বিদ্যালয়ের জন্য বাড়তি একটি চাপ। বিশেষ করে আর্থিক চাপ, যদি সরকার এটি বহন করে তবে সরকারেরও অনেক অর্থ এর পেছনে ব্যয় করতে হবে। তাই সরকার বিদ্যালয়ে এখন থেকেই যদি লিনাক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম চালু করতে পারে তবে বিপুল পরিমান অর্থের অপচয় রোধ করে তা দ্বারা আরো অনেক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রদান করতে পারবে। আমরা জানি লিনাক্সের রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষ করে ভাইরাস সমস্যা নেই। তাই এ বিষয়ের জন্যেও কোন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবেনা। যে শিক্ষার্থী জীবনে প্রথম কম্পিউটার ব্যবহার করবে তার কাছে উইন্ডোজ যেমন সহজ বা কঠিন মনে হবে লিনাক্স তেমন সহজ বা কঠিনই মনে হবে। যে কম্পিউটার শেখেনি তার কাছে সবই সমান। তাই আমরা একটি নতুন প্রজন্মকে মুক্ত ও ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম ও ওপেনসোর্স সফটওয়্যার তুলে দিতে পারি, এতে করে যেমন অর্থের সাশ্রয় হবে তেমনই তারা পাইরেসির অপবাদ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। তাই তো বইটিতে মুক্ত সোর্স সফটওয়্যার দেয়াটাকে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। লেখক: বিএড (অনার্স), এমএড, আইইআর, ঢাবি; কনটেন্ট রাইটার, অঙ্কুর আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, উত্তরা, ঢাকা।