রাত জেগে পড়ে যে, নিজ ক্ষতি করে সে

আমি অনেক রাত পর্যন্ত পড়ি। গত রাতেও ৩টা পর্যন্ত অঙ্ক করেছি। গর্ব করে এমন কথা যারা বলে, তারা আসলে নিজেদের বোকামিরই পরিচয় দিচ্ছে। কারণ রাত জেগে পড়লে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন অবলম্বনে বিস্তারিত জানাচ্ছেন মিজানুর রহমান

লেখাপড়ার চাপ অনেক। আসলেই কি তাই? পড়াশোনার বাইরেও কিছু চাপ আছে, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। এই যেমন মনের মধ্যে সারাক্ষণ খচখচ করতেই থাকে—বন্ধুর ছবিগুলো দেখা হয়নি, অমুককে ইনবক্স করা হয়নি, ওই সিরিজের সর্বশেষ পর্বটা দেখা হয়নি। এত সব করতে করতেই দেখা গেল বেজে গেছে রাত ১০টা। তারপর মনে পড়ে হোমওয়ার্কের কথা। অসুবিধা নেই? রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে সেরে ফেলবে? বাড়ির কাজ হলো ঠিকই, কিন্তু রাত জাগার কারণে দেখা গেল পরের দিন আর কোনো কাজের জন্য শক্তিই পাচ্ছ না। ভাবা হচ্ছে না অনেক আইডিয়া। পড়া হচ্ছে না বাড়তি কোনো বইপত্র। তিন দিন পর দেখলে রাত জেগে করা হোমওয়ার্কটা আর মনেই করতে পারছ না। কারণ ওটা তো মগজের হার্ডডিস্কে ঠিকমতো ঢোকেইনি।

প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত সবাই। কোনো কিছুতে কেউ পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। কিন্তু পড়াশোনাটা হলো অনেকটা খাবারের মতো। সুন্দর জামা, অনেক অনেক খেলনা বা টিভি সিরিজ দেখে এটার ঘাটতি কখনো পূরণ হবে না। লেখাপড়ার জন্য ১০০ বছর আগে যেমন সময় দিতে হয়েছিল, এখনো তাই। কিন্তু এখন সময় দেওয়ার মতো এত বেশি উপকরণ হাতের কাছে যে পড়াশোনাটাকে অনেকে অবচেতনেই রেখে দিয়েছ তালিকার শেষে। আর তাতেই ব্যাঘাত ঘটে ঘুমের।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্যস্ত ক্লাস রুটিন ও পড়ালেখার চাপের মধ্যেই ঠিক রাখতে হবে ঘুমও। কারণ ঘুম হলো মগজের খাবার। ভালো ফলের জন্যই তোমাকে ঠিকমতো ঘুমাতে হবে। একাদশ শ্রেণির ছাত্র তানিম আহমেদ জানাল, ঘুমাতে দেড়টা-দুইটা বেজে যায়। উঠি ৯টার দিকে। মাঝেমধ্যে আগেই উঠে যেতে হয়। কলেজের লেখাপড়ার চাপ আছে। কোচিং টিচারদের হোমওয়ার্কও রেডি করতে হয়। এ কারণেই দেরি হয়।

ঘুমের ওপর ভাগ বসাতে আধুনিক যুগে যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন সিরিজ। যেসব দিকে সময় দিয়ে শিশু-কিশোরদের যেন এখন ঘুমানোর ফুরসতও মেলে না। ফলে লেখাপড়া থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ও দৃষ্টিশক্তি।

শিক্ষার্থীরা কতখানি ঘুমায় তা দেখতে স্কুল ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর একটি ছোট জরিপ চালান এ প্রতিবেদক। ৫০ জন ছাত্র-ছাত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় রাতে তারা কখন ঘুমাতে যায়। ফলাফলে দেখা যায় শহরের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই বলেছে, তাদের রাতের ঘুমের সময় ১২টার পর। এর মধ্যে ১৪ শতাংশ ঘুমায় রাত ২টার পর!

রাতে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে উঠে আসে লেখাপড়ার চাপ, কম্পিউটার-মোবাইল গেমস, ফেসবুকিং ও এনিমেশন ছবি দেখার প্রবণতা। ইন্টারনেট দেখার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে স্কুল ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর ফেসবুকে ঢুঁ মারলে বেশ কয়েকজনের অ্যাকটিভিটি মধ্যরাত থেকে শুরু করে রাতের শেষ ভাগ পর্যন্ত দেখা গেছে। তবে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। তারা জানায়, রাত ৯টা থেকে সর্বোচ্চ ১২টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে।

স্বভাবতই দেরিতে ঘুমালে সকালে উঠতেও দেরি হয়। ফলে ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’-এর প্রবাদটি যেন একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে এ প্রজন্মের কাছে। এ বিষয়ে শিক্ষকদের কাছেও জানতে চাওয়া হয় তাঁরা সকালবেলার শ্রেণিকক্ষে তন্দ্রাচ্ছন্নতা দেখতে পান কি না। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভুইয়া বলেন, সকালের শিফটে যাদের ক্লাস হয় তাদের মধ্যেই এমনটা বেশি দেখা যায়। তবে তাদের সংখ্যা যে খুব বেশি তা বলব না। তিনি বলেন, রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার নির্দেশনা আমরা শুধু ছাত্রদের দিই না, অভিভাবকদেরও বলে দিই। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের তো একটু বেশি ঘুমানো উচিত। তারা ক্লান্ত হয় দ্রুত। না ঘুমালে মেধার বিকাশেও সমস্যা হয়। যাদের সকাল ৬টায় ক্লাস থাকে তাদের ১০টার মধ্যেই ঘুমানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

কতক্ষণ ঘুম?

স্লিপ ফাউন্ডেশন ডট অর্গের তথ্য মোতাবেক ৬ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের দিনে কমপক্ষে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৮-১০ ঘণ্টা, আর ১৮ থেকে বড়দের ঘুমানো উচিত সাত-আট ঘণ্টা।

রাতের ঘুম দিনে হয়?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রাত জাগাকে কার্সিনোজেনের সঙ্গে তুলনা করে থাকে। অর্থাৎ এটা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে কাজ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার-বিষয়ক গবেষণা বিভাগ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের তথ্য মতে, যখন সূর্যের আলো থাকে না তখন শরীরকে কাজ করতে বাধ্য করা বা জাগিয়ে রাখা শরীরে মেলাটনিন হরমোন তৈরিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। আর এই মেলাটনিনই মানুষের দেহে টিউমারের বৃদ্ধিকে রোধ করে। ফলে তাদের ধারণা, রাত জাগা মানুষদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ রাতের ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি কোনোভাবেই দিনের বেলায় ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যায় না।

ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, যাদের ঘুমের নির্দিষ্ট সময় থাকে না অর্থাৎ যারা আজ রাত ৯টায় ঘুমায় তো কাল রাত ৩টায়, তারা অনেক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে। অনিয়মিত ঘুমের কারণে শরীরের এক-তৃতীয়াংশ জিনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। যার ফলে অল্প বয়সেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হূদরোগও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিসের তথ্য মোতাবেক দুই লাখ আট হাজার তরুণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যাদের বয়স ২০ বছরের কম। এজাজুর রহমান নামে এক তরুণ ডায়াবেটিস রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, এটি ধরা পড়ে তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্র। ঘুম নিয়েই বেশি অনিয়ম করতেন বলে জানান তিনি।

রাত জাগার স্বাস্থ্যঝুঁকি

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে : হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের একটি প্রকাশনায় বলা হয়, একজন সুস্থ মানুষ প্রতি ৯০ মিনিট পর পর ঘুমের গভীর থেকে গভীরতর ধাপের দিকে যায়। যার মধ্যে সবচেয়ে গভীর ঘুমের সময় মানুষের ফিজিওলজিক্যাল পরিবর্তন আনে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অনিয়মিত ঘুমের কারণে ঘুমে বিঘ্ন ঘটে, ফলে মানুষ গভীর ঘুমের ধাপ পর্যন্ত যেতেই পারে না। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

মনোযোগে ঘাটতি : প্রাকৃতিক ঘুমের সময়ের ব্যাঘাত ঘটিয়ে অন্য সময়ে ঘুমানো মনোযোগ ঘাটতির জন্ম দিতে পারে।

কণ্ঠস্বর বদলে যায় : তোমরা খেয়াল করে থাকবে যে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে গলা কিছুটা ভারী হয়ে যায়। নিয়মিত এমন হলে কণ্ঠস্বরে স্থায়ী একটি পরিবর্তন আসতে পারে। এতে করে যারা বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় কাজ করার চিন্তা করছ, তারা রাত জাগার বিষয়ে সিরিয়াসলি ভাব।

ওজন বাড়ে : রাত জাগলে সাধারণত দিনে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। ফলে সারা দিন ফাস্ট ফুড থেকে শুরু করে অন্যান্য খাবারের দিকে আগ্রহ থাকে, যা ওজন বাড়াতে পারে। আর বাড়তি ওজন নিয়ে পড়াশোনার মতো ‘ভারী’ কাজ করাও কিন্তু ঝামেলার।

অবসাদ : অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত ঘুমের সবচেয়ে বড় মানসিক সমস্যা এটি। এর ফলে বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া ও ঘন ঘন ভুলে যাওয়ার রোগ আলজেইমার্স হতে পারে।

চোখের ক্ষতি : রাত জেগে পড়া চোখের জন্যও ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট ওয়েস্ট আই ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী রাত জাগার ফলে আই স্পাজম বা চোখে খিঁচুনি হতে পারে, যাকে মায়োকিমিয়া বলা হয়। ড্রাই আই জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

ইলেকট্রনিকসের প্রভাব

জরিপে রাত জাগার কারণ হিসেবে উঠে আসে ইলেকট্রনিকসের ব্যবহারও। ইলেকট্রনিকস অর্থাৎ মোবাইল, পিসি বা টেলিভশন ব্যবহার করার কারণে যারা রাত জাগো, তাদের জন্য ক্ষতিটি এককথায় দ্বিগুণ। প্রথমত, ঘুমের অনিয়মের কারণে শরীর ও মনের ক্ষতি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ইলেকট্রনিকস ব্যবহারের ফলে চোখের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। বাংলাদেশের স্কুল ও কলেজগুলোয় ছাত্র-ছাত্রীদের চোখে মোটা চশমা এখন এতটাই সাধারণ যে চশমা ছাড়া শিক্ষার্থীর দেখা পাওয়াই দুষ্কর।

ইয়োর সাইট ম্যাটারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেফ টেলর একটি ব্লগে লেখেন, সাধারণত আমরা প্রতি মিনিটে ১৫ বার পলক ফেলি। স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় এটি কমে অর্ধেক হয়ে যায়। ফলে চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একে সিভিএস বা কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোম বলে। তিনি বলেন, এখন প্রতি চারজনে একজন চোখের রোগী সিভিএস সিন্ড্রোমে আক্রান্ত।

রাত জাগলে ফল খারাপ!

বেশির ভাগ ছাত্রকে পরীক্ষার আগে অনেক দিন ধরে রাত জেগে লেখাপড়া করতে দেখা যায়। ওই সময়টায় তারা এমন এক ঘুমের অভ্যাস তৈরি করে, যা আগে ছিল না। তোমাদের মনে হতে পারে শরীরের ওপর একটু চাপ গেলেও ফল তো ভালো হবে। এমন যারা ভাবছ তাদের জন্য দুঃসংবাদ হলো, রাত জেগে পড়লে ফলাফল ভালো নয়, উল্টো খারাপ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার গবেষক ইউলিয়াম ই কেলি ‘দ্য রিলেশনশিপ বিটুইন স্লিপ লেংথ অ্যান্ড গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ এমাং কলেজ স্টুডেন্টস’ বা কলেজ ছাত্রদের মধ্যে ঘুমের দৈর্ঘ্য ও জিপিএর সম্পর্ক শিরোনামের গবেষণায় দেখতে পান, একই লেসন শেষ করা ছাত্রদের মধ্যে যারা পর্যাপ্ত ঘুমাতে পেরেছে, তাদের ফলাফল কম ঘুমানোদের চেয়ে ভালো।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান জার্নালের গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল কাজের জন্য সবাই গভীর রাতকে যতই গুরুত্ব দিক না কেন, আদতে ওই সময় মাথা ঠিকমতো কাজই করে না। তাই রাত না জেগে ঘুমানোই বুদ্ধিমানের কাজ। লেখাপড়ার চাপ থাকলে সেটা সারতে হবে ভোরের দিকে। তাই আজই একটা ঘুমের রুটিন বানিয়ে নাও। রুটিন বানাও স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের জন্যও।