সেশনজট নেই আছে সহযোগিতা আন্তরিকতা

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার রায়হানা খাতুন আরও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েকে বাড়ি থেকে দূরে কোথাও পড়তে যেতে দিতে বাবার খুব একটা সায় ছিল না। রায়হানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব ভালোবাসেন। তাই বাবার পরামর্শে বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে যান। শুরুতে খানিকটা দ্বিধা কাজ করছিল। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়...ক্যাম্পাস জীবনটা কেমন হবে, কে জানে! কিন্তু কিছুদিন যেতেই ক্যাম্পাসকে ভালোবেসে ফেলেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রায়হানার পড়াশোনা শেষ হয়েছে। স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় ও স্নাতকোত্তরে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এখন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। বললেন, সব বিষয়ে শিক্ষকদের সহযোগিতা ছিল অতুলনীয়। তাঁরা কখনো ছিলেন বন্ধু, কখনো অভিভাবক।

গণিত বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র মো. সানজিদ হাসান বললেন, ‘ভর্তির পর কখনো বুঝতে পারিনি যে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। শিক্ষকেরা সব সময় আন্তরিক ছিলেন।’

রায়হানা ও সানজিদের মতো গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানালেন তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা। কোনো সেশনজট ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কোর্স শেষ করতে পেরে তাঁরা খুব খুশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে অনেকেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন, অনেকে প্রবেশের অপেক্ষায় আছেন।

শুরুর কথা

প্রায় ৫৫ একর জমিতে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক—এই চারটি অনুষদের অধীনে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিকস, গণিত, ব্যবস্থাপনা ও ইংরেজি বিষয় নিয়ে যাত্রা শুরু হয় গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের। পরবর্তী সময়ে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে আরও দুটি অনুষদ ও ছয়টি বিভাগ চালু হয়। পরের শিক্ষাবর্ষে চালু হয় আরও তিনটি বিভাগ ও একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট। সব মিলিয়ে বর্তমানে ৮টি অনুষদের অধীনে ২৩টি বিভাগ রয়েছে। আছে ২টি ইনস্টিটিউট: বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং শেখ হাসিনা কৃষি ইনস্টিটিউট।

সবশেষ ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ২ হাজার ২০৭ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজার ১। এ ছাড়া এমফিল, পিএইচডি, ইএমবিএ ও এলএলবি প্রোগ্রামে আরও ২৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। শিক্ষক ৯২ জন, কর্মকর্তা ৪০, কর্মচারী ১৫৭ জন। রয়েছে দুটি ছাত্র ও দুটি ছাত্রী হল।

ক্যাম্পাস ঘুরে

গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে খুলনা রোড ধরে চার কিলোমিটার এগোলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। গত ২৩ জানুয়ারি দুপুরে চোখে পড়ল ছিমছাম ক্যাম্পাস। চারদিকে গাছগাছালি। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ভবনের সামনে আড্ডা দিচ্ছেন। কথা হলো হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, খুলনা সদর হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা অনিকুল ইসলামের সঙ্গে। বললেন, ‘আমি দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। প্রচণ্ড অনিশ্চয়তা নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। পরে দেখলাম ভুল করিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বড় ভাইয়েরা যথেষ্ট আন্তরিক। আমাদের সহযোগিতা করেন। ক্লাস হচ্ছে নিয়মিত।’

ইংরেজি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মো. মাহাবুবুল আলম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে আমি খুশি। শিক্ষকেরা যে পিতৃসুলভ হন তা এখানে না আসলে বুঝতাম না। ক্যাম্পাসে প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে। দেখে আমার মন ভরে যায়।’

লোকপ্রশাসন বিভাগের ছাত্রী যশোরের রেহেনুমা তাবাসসুম বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব শিক্ষার্থী পাস করে বের হয়েছেন, তাঁরা সবাই চাকরি পেয়েছেন। বিষয়টা তাঁকে উৎসাহিত করেছে।

সমস্যা

দুটি হলের আসনসংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। তাই অনেক শিক্ষার্থীকে আশপাশের মেসে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো অস্বাস্থ্যকর, আবার ভাড়াও বেশি। আছে শিক্ষকসংকট। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সংখ্যা খুব কম। এখানকার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন। তাই বাইরে থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় বা কিনে আনতে হয়। সাতটি বাস সার্ভিস থাকলেও সেটা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুপাতে যথেষ্ট নয়। খুলনার শিক্ষার্থী বেশি হলেও সেই রুটে বাস চলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো ক্যানটিন।

আধুনিক চাহিদাসম্মত পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে খোন্দকার নাসিরউদ্দিন উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির প্রত্যয় নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স শেষ করে বের হয়ে গেছেন ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। আধুনিক চাহিদাসম্মত পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক গবেষণাগার। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের সঙ্গে একটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ভালদোস্টা স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আরেকটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে গত বছর। এর ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওই দুটি প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে পারবেন।

এ বছর ৩৭ জন নেপালি শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়েছেন। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সংগ্রহ রয়েছে। পানির সংকট সমাধানে পৌরসভার সঙ্গে কথা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে একটা সমাধান পাওয়া যাবে। আর আবাসনসংকট মোকাবিলায় আরও দুটি হলের নির্মাণকাজ চলছে। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিন্দুমাত্র উদ্যোগের অভাব নেই।

টুঙ্গিপাড়ার কুশলীতে ১২ বিঘা জমিতে বর্তমানে বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়ার অ্যান্ড বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং শেখ হাসিনা কৃষি ইনস্টিটিউটের ক্লাস ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতো এটির সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।